প্রবাসীদের বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কমিটি চায় সেন্টার ফর এনআরবি

দেশীয় অর্থনীতির লাইফ লাইন প্রায় সোয়া কোটি প্রবাসীর উল্লেখযোগ্য অংশই করোনার কারণে আজ বিপর্যস্ত! প্রবাসী আয়ে গড়ে ওঠা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ক’মাসে প্রায় ভেঙ্গে পড়েছে। গর্বের রেমিটেন্সে টান পড়েছে, এটা ক্রমাগত কমছে। ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে যে প্রবাসীরা অনিয়মিতভাবে দান-খয়রাত করতেন আজ তাদের অনেকের পরিবারই অর্থ ও খাদ্য কষ্টে! অসহ্য এবং বিরক্তিকর এক পরিস্থিতি তারা নীরবে সামলে ওঠার চেষ্টা করছেন। লোক-লজ্জার ভয়ে না পারছেন হাত পাততে, না পারছেন সইতে। তবে বৈশ্বিক ওই সঙ্কট প্রলম্বিত হলে লজ্জার পর্দা উঠে যাবে- এমন মন্তব্য করে সেন্টার ফর এনআরবি’র চেয়ারপারসন এম এস সেকিল চৌধুরী বলেন, বড় সঙ্কট সামনে। কমপক্ষে ২০ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরতে বাধ্য হতে পারেন। তারা এ মাটির সন্তান। তাদের গ্রহণ করতেই হবে।

কিন্তু কাজটি সহজ হবে না। সামগ্রিকভাবে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মারাত্নকভাবে আঘাত করবে।

কিন্তু কিভাবে তা মোকাবিলা সম্ভব হবে? মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে মিস্টার চৌধুরী নানা কথা বলেন। যে বিষয়টিতে তিনি জোর দেন তা হলো- আর এক মুহুর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না। এতে রাগ বা গোস্বা করার কিছু নেই। কোন মন্ত্রী কার পেছনে, কার সামনে বসবেন- তা চিন্তার সময় নেই। দেশ বাঁচাতে হবে। মানুষ যেমন বাঁচাতে হবে তেমনি অর্থনীতিও। সেকিল চৌধুরী মনে করেন- প্রবাসী ইস্যুতে ডিপ্লোম্যাটিক যে উদ্যোগ সেটি সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হতে হবে। ছোট পর্যায়ে আলোচনা করে সমাধান আসবে না। দেশে স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি সেল বা কমিটি গঠন করতে হবে। আর ওই কমিটির সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ আমাদের দেশের কর্মধারার গতি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই সেটি হতে হবে, তা না হলে কোন কাজই হবে না। প্রবাসীদের নিয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে কাজ করা ওই এক্সপার্টের পরামর্শ হচ্ছে- হাই প্রোফাইল ওই কমিটি প্রতি মাসে একটি করে টেলিকনফারেন্স করবে। মিডিয়া কনফারেন্সও হতে পারে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে
তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত দিবে। একটি কার্যকর ওয়েআউট বের করবে। ইস্যু ভিত্তিক আলোচনায় কমিটিতে প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করা দক্ষ সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি, রিটায়ার্ড আমলা, অ্যাম্বাসেডরদের ইনভলভ করা যেতে পারে। সেকিল চৌধুরী বলেন, কমিটি বা সেল যেভাবেই গঠিত হোক না কেন কাজটি হতে হবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। তদারকি তো বটেই। তা না হলে সোশ্যাল ইমব্যালেন্স তৈরি হবে।

ফেরত আসা প্রবাসীদের চাল, ডালসহ জীবন ধারণের উপকরণ লাগবে

সেন্টার ফর এনআরবি’র চেয়ারপারসনের কাছে প্রশ্ন ছিল- মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী শ্রমিকরা তো বটেই, করোনায় ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ পূর্ব-পশ্চিমের সর্বত্রই বাংলাদেশিরা আজ বিপদে। কেবল সৌদি আরব থেকেই ৩-৫ বছরে ১০ লাখের মতো বাংলাদেশি ফিরছেন। মন্ত্রী-রাষ্ট্রদূতও তা কবুল করেছেন। বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন? জানতে চাইলে মিস্টার চৌধুরী বলেন, ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কায় করোনা সঙ্কটের সূচনাতেই আমরা (আমার প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে) টেলিকনফারেন্স করেছিলাম বিশ্বব্যাপী। সেখানে আমরা পেয়েছি, করোনা ভাইরাসের কারণে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে প্রবাসীরা। কারণ যেসব দেশে তারা বাস করছেন সে সব দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যখন বন্ধ হবে তখন তারা কর্মহীন হয়ে পড়বেন। অনেকে মাস বা ঘণ্টা হিসেবে কাজ করেন। কাজ না থাকলে তারা বেতন পাবেন না। তাছাড়া সাম্প্রতিক কালে তেলের দামও পড়ে গেছে। ফলে অনেককে ফিরে আসতে হবে। ওমান, কুয়েত, বাহরাইন প্রত্যেকটা দেশ থেকে মানুষ ফিরে আসার প্রবণতা বা ঝোঁক তৈরি হয়েছে। সেই সরকারগুলো বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিচ্ছে লোক ফেরত নিতে। কারণ কর্মহীনরা হয়তো ক্যাম্পে বসে আছেন এবং করোনা পরিস্থিতিতে যেখানে তারা আছেন সেটিও তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বা সুন্দর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে তাদের বসবাসের সূযোগ কম। দু’দিন আগে বা পড়ে এদের ফেরাতে হবে। তাদের দেশেই পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে তাদের কর্মসংস্থান কিভাবে নিশ্চিত হবে? সেকিল চৌধুরী বলেন, আমাদের টেলিকনফারেন্সে একটি কথা উঠে এসেছে তা হলো- বিভিন্ন ধরণের প্যাকেজ দিয়ে যেভাবে ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে সরকার, সেভাবে প্রবাসীদের কর্মসংস্থানে প্রকল্প গ্রহণ এবং তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। আমি মনে করি এটাই কার্যকর পথ। তিনি বলেন, এই সোয়া কোটি প্রবাসী সারা জীবন দেশকে দিয়েছেন। ভোগ করেছেন সামান্যই। আজ তারা বিপদে পরিস্থিতির কারণে। এদের এখন চাল, ডাল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, জীবন ধারণের জন্য সব কিছুরই প্রয়োজন হবে। এতো দিন তাদের তা লাগেনি। ফলে এগুলো নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে এখনই। ঢাকা চেম্বারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে দায়িত্বপালনকারী সেকিল চৌধুরী বলেন, দেখেন ৩০-৪০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজের জন্য অস্থির হয়ে গেছে অর্থনীতি। কিন্তু এরা লোকাল কনজামশন করতো। অস্থায়ীভাবে বা টেম্পোরারিকাজ তাদের কাজ বন্ধেই অস্থির অবস্থা। সেই তুলনায় প্রবাসীদের সঙ্কটটি অনেকটা স্থায়ী বা দীর্ঘ মেয়াদি। যাই হোক সমস্যা বহুমুখি। সরকারকে নানা বিষয় ভাবতে হচ্ছে। তবে প্রবাসীদের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে বিপদ বাড়বে। উদ্বেগের সঙ্গে তিনি বলেন , মধ্যপ্রাচ্যে দেশগুলো জেল খালি করছে। হাজতি কয়েদিদের খালাস দিয়ে দেশে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে। অনেক বাংলাদেশি হয়তো দেশগুলোর খরচে ফিরছেন। কিন্তু ইরাকসহ অনেক দেশ থেকে বাংলাদেশীদের বিমান পাঠিয়ে আনতে হতে পারে। সেই ট্রান্সপোর্টেশন কিভাবে হবে- তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।

প্রবাসী নির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিও বাঁচাতে হবে

করোনা সঙ্কট প্রবাসী  আয়ের ওপর নির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ ফেলবে? এমন প্রশ্নে সেকিল চৌধুরী বলেন, আমি সব সময় বলি যে বাংলাদেশের গ্রামের অর্থনীতি শতকরা ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ প্রবাসী অর্থায়নে পরিচালিত। এটা কিন্তু বসে যাবে। আমাদের গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর অধিকাংশই ব্যাংকের টাকায় নয়, প্রবাসীদের কাছ থেকে নেয়া লোন বা মালিকানায় চলে। এগুলো খুব গোছালো বা অরগানাইজড না কিন্তু এগুলোই বাস্তবতা। গ্রামের অনেক অর্থায়ন তাদের মাধ্যমে হতো। এগুলো ধর্মীয় কারণে হোক বা বিভিন্ন কারণে প্রবাসীরা মানুষকে সাহায্য করতেন। প্রবাসীরা বিপাকে পড়ায় এখন সামগ্রিকভাবে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক ধ্বস নামার অাশংঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশে গত বছর সাড়ে আঠারো মিলিয়ন রেমিটেন্স এসেছে। আপনাদের পত্রিকায় লিড নিউজ হয়েছে। আমরা বলেছি, মাশাল্লাহ। ইনসেনটিভের কারণে এ বছরেই আমরা বাইশ থেকে তেইশ মিলিয়নে যাব বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু করোনা সব উলট পালট করে দিয়েছে। এই বছর ৫০ পারসেন্ট রেমিটেন্স কমে আসবে মিনিমাম। কারণ সব দেশে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। কবে খুলবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী ফিরে আসছেন। হয়তো তারা আবারও পড়তে যাবেন। কিন্তু সেখানেও অনিশ্চয়তা আছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে।

সেকিল চৌধুরী বলেন, এটা সরকারের কোনো ব্যর্থতার কথা নয়। অনেক সময় সরকার খারাপ খবরগুলো চেপে রাখতে চায়। রোগী মারা গেলে বলতে চেয়েও বলতে চায় না। আমাদের বুঝতে হবে এটা তো সরকার মারছে না, পরিস্থিতির কারণে মারা যাচ্ছে। এইযে প্রবাসীরা ফিরছেন, অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, এটা নিয়ে ইমিডিয়েট ইন্টারভেনশন দরকার ছিলো। আমিতো মনে করেছিলাম, মন্ত্রী এবং বিভিন্ন দায়িত্বে যারা আছেন তাদের সঙ্গে ওভার টেলিফোনে বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলি। এই যে দেখেন অনেকে আমেরিকায় গিয়ে অনেকে আটকা পড়েছেন। বহু মানুষ ফিরতে পারছেন না। তারা প্রতিদিন যোগাযোগ করছেন। মালয়েশিয়াতেও বহু লোক আটকা আছেন। ভারতে আটকেপড়াদের অবশ্য ফেরানো হচ্ছে। ইংল্যান্ডেও মনে হয় চেষ্টা হচ্ছে কিছু লোক ফেরানোর। আমাদের এই মানুষগুলোকে আনতে হবে। সব জায়গায় এই লোকগুলো কিন্তু খুব খারাপ অবস্থায় আছেন। যে পরিস্থিতি, একজন সচ্ছল লোকও নিঃস্ব হওয়ার পথে। কারণ হয়তো আপনি গেছেন ১০ দিনের জন্য, পরিস্থিতিতে পড়ে ২ মাস থাকতে হচ্ছে। আপনিতো ফকির হবেনই। এই জায়গায় আমাদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যক্তিখাতকে সঙ্গে নিতে হবে। ন্যাশনাল এটিচিউট বা ন্যাশনাল এপ্রোচ নিতে হবে। আমরা উন্নত দেশগুলোতে দেখি যখন কোন একটা ন্যাশনাল ক্রাইসিস দেখা দেয় তখন কে কোন দল করে তার চিন্তা না করে স্কিল লোকদের ডেকে নেয়া হয়। আপনি দেখেছেন আমেরিকাতে কোন ক্রাইসিস হলে সাবেক প্রেসিডেন্টদের কাজে লাগানো হয়। কালকে ফিলিপাইনের একটা ডিকলারেশন হয়তো শুনে থাকতে পারেন। বলা হয়েছে- বিদেশে যতো কর্মী আছে প্রয়োজনে সবাইকে ফিরিয়ে নেবে ম্যানিলা। আমি জানি না তার ইকোনমি এটা এলাও করবে কি-না? আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি আমাদের ইকোনমি এলাও করবে না। বড় গলায় বলে লাভ নাই। ১ লাখ প্রবাসী শ্রমিক যদি বাই ট্রান্সপোর্টেশন (নিজস্ব খরচে) আমাদের আনতে হয় তাহলে সাংঘাতিক কষ্ট হবে। ফলে যেটা করতে হবে জাতিসংঘ, আইওএমসহ অভিবাসীদের কাজ করা বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আমাদের স্ট্রং রিলেশন করতে হবে। প্রিয়রলি শুধু প্রবাসীদের বিষয়ে কাজ করতে হবে। ফেরত আসা প্রবাসীরা যে কাজকর্ম শিখেছেন দেশে তাদের ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকে ফ্যাক্টরি চালাতেন, ফার্মে কাজ করেতেন, তাকে লোন দিয়ে সেভাবেই কিছু একটা করে দিতে হবে। এই ২%, ৩% লোন দেয়া হচ্ছে এগুলো দেয়া এবং ডাইরেক্ট পারসিং মেথডে কিন্তু অনেক কেনাকাটা হয় যখন স্বাভাবিক পরিস্থিতি আসবে তখন তাদের ইনভলভ করা যেতে পারে। এতে তখন তারা কর্মসংস্থান পাবে। তারা বেকার ঘুরলে সামাজিক সঙ্কট তৈরি হবে। কারণ তারা কাজ করে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

সতর্কতা: সেকিল চৌধুরী বলেন, তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে লোন বা ঋণ প্রদানে। যদি বিভিন্ন লোক ডেকে লোন দিয়ে দেয়া হয়, যারা মদ গাজায় আসক্ত বা ব্যবসা করে তাদেরকে লোন দিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here